রোগীদের জন্য

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ছানি, লেন্স নির্বাচন, গ্লুকোমা এবং জটিল চোখের অস্ত্রোপচার নিয়ে রোগীরা যেসব প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি করেন, তার সহজ উত্তর।

লিখেছেন ও পর্যালোচনা করেছেন

ডা. মো. ইফতেখার ইকবালএমবিবিএস, এমএস

সহকারী অধ্যাপক, চক্ষুবিজ্ঞান

কনসালট্যান্ট — গ্লুকোমা, ছানি এবং জটিল এন্টেরিয়র সেগমেন্ট রোগের সার্জন

বিএমডিসি রেজি: A-56960

সর্বশেষ পর্যালোচনা

পড়ার আগে জেনে নিন। এখানে চোখের সাধারণ রোগ ও অস্ত্রোপচার নিয়ে সাধারণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। এটি সরাসরি পরীক্ষার বিকল্প নয়। প্রতিটি চোখ আলাদা, এবং সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে আপনার নিজের পরীক্ষার ফলাফলের উপর। কোনো উপসর্গ বা রোগ ধরা পড়ে থাকলে চেম্বারে এসে নিজের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করুন।

ছানি প্রিমিয়াম কৃত্রিম লেন্স গ্লুকোমা MIGS — স্বল্প আঘাতযুক্ত গ্লুকোমা অস্ত্রোপচার জটিল এন্টেরিয়র সেগমেন্ট সার্জারি সাধারণ

ছানি

ছানি কী?

ছানি হলো চোখের স্বাভাবিক লেন্স ধীরে ধীরে ঘোলা হয়ে যাওয়া। এতে ঝাপসা দেখা, আলোতে ঝলকানি, রাতে দেখতে অসুবিধা এবং রঙ ফিকে লাগতে পারে। সাধারণত বয়সের সঙ্গে হয়, তবে আঘাত, ডায়াবেটিস, স্টেরয়েড ব্যবহার বা অন্য চোখের রোগ থেকেও হতে পারে।

কখন ছানির অপারেশন করা উচিত?

যখন ছানির কারণে পড়া, গাড়ি চালানো, কাজ করা বা মানুষ চিনতে অসুবিধা হয়, তখন অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া হয়। ছানি পুরোপুরি “পেকে” যাওয়ার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

ছানির অপারেশন কি ব্যথাযুক্ত?

না। আধুনিক ছানি অপারেশন সাধারণত চোখে ড্রপ দিয়ে অবশ করে করা হয় এবং অধিকাংশ রোগী ব্যথা অনুভব করেন না।

অপারেশনে কত সময় লাগে?

জটিলতাবিহীন অপারেশনে সাধারণত ১০–২০ মিনিট লাগে। তবে প্রস্তুতি ও অপারেশনের পরের সময় ধরে সব মিলিয়ে আরও কিছুটা সময় হাতে রাখতে হয়।

ছানি কি আবার হয়?

না, ছানি আবার হয় না। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কৃত্রিম লেন্সের পেছনের পাতলা ঝিল্লি ঘোলা হতে পারে, যা লেজারের মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই পরিষ্কার করা যায়।

সেরে উঠতে কতদিন লাগে?

অনেক রোগী কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো দেখতে শুরু করেন। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে সাধারণত চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগে।

অপারেশনের পর কী কী মেনে চলতে হবে?

নিয়ম মেনে ড্রপ ব্যবহার করবেন, চোখ ঘষবেন না, কয়েক দিন চোখে পানি ও ধুলাবালি লাগানো থেকে বিরত থাকবেন, শুরুর দিকে ভারী কাজ এড়িয়ে চলবেন এবং প্রতিটি ফলোআপে আসবেন।

প্রিমিয়াম কৃত্রিম লেন্স

কৃত্রিম লেন্স (আইওএল) কী?

ছানি অপারেশনের সময় ঘোলা হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক লেন্সের পরিবর্তে যে কৃত্রিম লেন্স বসানো হয়, সেটিই ইন্ট্রাঅকুলার লেন্স বা আইওএল।

প্রিমিয়াম লেন্স কী?

সাধারণ মনোফোকাল লেন্সের চেয়ে বাড়তি সুবিধা দেয় এমন লেন্সকে প্রিমিয়াম লেন্স বলা হয়। ধরন অনুযায়ী এগুলো দূর, মাঝারি বা কাছের দৃষ্টিতে চশমার নির্ভরতা কমাতে পারে, কিংবা অ্যাস্টিগমাটিজম সংশোধন করতে পারে।

কী কী ধরনের লেন্স রয়েছে?

মনোফোকাল, টরিক, ইডিওএফ (EDOF), ট্রাইফোকাল ও মাল্টিফোকাল। কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত তা নির্ভর করে চোখের অবস্থা, জীবনযাত্রা ও প্রত্যাশার উপর।

সবাই কি প্রিমিয়াম লেন্স নিতে পারেন?

না। গ্লুকোমা, রেটিনার রোগ, কর্নিয়ার অসমতা, আগের চোখের অপারেশন বা তীব্র শুষ্ক চোখ থাকলে সব ধরনের প্রিমিয়াম লেন্স উপযুক্ত নাও হতে পারে।

গ্লুকোমা থাকলে কি প্রিমিয়াম লেন্স নেওয়া যায়?

কিছু ক্ষেত্রে যায়, তবে সবার ক্ষেত্রে নয়। গ্লুকোমার তীব্রতা, ভিজ্যুয়াল ফিল্ডের অবস্থা, অপটিক নার্ভের স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গ্লুকোমা

গ্লুকোমা কী?

গ্লুকোমা এমন কয়েকটি রোগের সমষ্টি যেখানে অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রায়ই চোখের ভেতরের চাপ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। চিকিৎসা না করলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে।

গ্লুকোমা কি ভালো হয়ে যায়?

গ্লুকোমায় ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়া দৃষ্টি সাধারণত ফিরে আসে না। তবে আগেভাগে শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করলে বাকি দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব।

গ্লুকোমায় কি সবসময় লক্ষণ থাকে?

না। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো লক্ষণই থাকে না। এ কারণেই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো এত জরুরি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন?

৪০ বছরের বেশি বয়স, পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস, ডায়াবেটিস, চোখের প্রেশার বেশি থাকা, উচ্চ মায়োপিয়া, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহার এবং চোখে আঘাতের ইতিহাস — এসবই ঝুঁকি বাড়ায়।

গ্লুকোমা কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

চোখের প্রেশার পরিমাপ, অপটিক নার্ভ পরীক্ষা, গনিওস্কোপি, ওসিটি (OCT), ভিজ্যুয়াল ফিল্ড টেস্ট এবং কর্নিয়ার পুরুত্ব পরিমাপের মাধ্যমে।

অপারেশন ছাড়া কি গ্লুকোমার চিকিৎসা সম্ভব?

হ্যাঁ। রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চোখের ড্রপ, লেজার, MIGS অথবা প্রচলিত গ্লুকোমা অপারেশন — এর যেকোনোটি প্রয়োজন হতে পারে।

MIGS — স্বল্প আঘাতযুক্ত গ্লুকোমা অস্ত্রোপচার

MIGS কী?

MIGS হলো আধুনিক গ্লুকোমা অস্ত্রোপচারের একটি ধারা, যেখানে খুব ছোট পথ ব্যবহার করে এবং টিস্যুর ক্ষতি কম করে চোখের চাপ কমানো হয়।

কারা MIGS-এর জন্য উপযুক্ত?

মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার গ্লুকোমা রোগী, বিশেষ করে যাদের একই সঙ্গে ছানির অপারেশনও প্রয়োজন, তারা অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত হতে পারেন।

MIGS-এর সুবিধা কী?

ছোট ছেদ, দ্রুত সেরে ওঠা, তুলনামূলক নিরাপদ পদ্ধতি, নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে ড্রপের নির্ভরতা কমে যাওয়া, এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে অন্য অস্ত্রোপচারের জন্য কনজাংটিভা অক্ষত থাকা।

MIGS কি সব ধরনের গ্লুকোমা অপারেশনের বিকল্প?

না। গুরুতর (অগ্রসর পর্যায়ের) গ্লুকোমায় ট্র্যাবেকুলেক্টমি বা গ্লুকোমা ড্রেনেজ ডিভাইসের প্রয়োজন হতে পারে।

জটিল এন্টেরিয়র সেগমেন্ট সার্জারি

জটিল এন্টেরিয়র সেগমেন্ট সার্জারি কী?

কর্নিয়া, আইরিস, লেন্স, ক্যাপসুল, জোনিউল ও চোখের সামনের প্রকোষ্ঠের এমন জটিল অবস্থার চিকিৎসা, যেখানে সাধারণ ছানি অপারেশন যথেষ্ট নয়।

পিউপিলোপ্লাস্টি কী?

আঘাত বা আগের অস্ত্রোপচারে চোখের মণি (পিউপিল) ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা স্থায়ীভাবে বড় হয়ে গেলে সূক্ষ্ম সেলাইয়ের মাধ্যমে সেটিকে আবার গোলাকার ও কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনার অস্ত্রোপচারকে পিউপিলোপ্লাস্টি বলা হয়।

পিউপিলারি সারক্লেজ কখন প্রয়োজন হয়?

আঘাতের কারণে চোখের মণি স্থায়ীভাবে বড় হয়ে গেলে (ট্রমাটিক মাইড্রিয়াসিস), অর্থাৎ মণি ছোট করার পেশি ছিঁড়ে গেলে, পিউপিলারি সারক্লেজ করা হয়। আইরিসের চারপাশ দিয়ে একটি টানা সেলাই দিয়ে মণিকে ছোট করে স্বাভাবিক আকারের কাছাকাছি আনা হয়।

মণি স্থায়ীভাবে বড় থাকলে কী সমস্যা হয়?

মণি ছোট হতে না পারলে চোখে অতিরিক্ত আলো ঢোকে। ফলে আলোয় প্রচণ্ড ঝলকানি লাগে, চোখ কড়া লাগে এবং স্পষ্ট দেখতে অসুবিধা হয়। অনেকে রোদে বা রাতে গাড়ির আলোর সামনে চোখ খুলে রাখতে পারেন না। অস্ত্রোপচারে দৃষ্টির সমস্যা ও চোখের চেহারা — দুটোরই উন্নতি হয়।

অন্য অস্ত্রোপচারের সঙ্গে কি একসঙ্গে করা যায়?

হ্যাঁ। ছানি অপারেশন, কৃত্রিম লেন্স বসানো বা স্ক্লেরাল ফিক্সেশনের সঙ্গে একই সময়ে করা যায়। গুরুতর আঘাতের পর এসব সমস্যা প্রায়ই একসঙ্গে দেখা দেয়।

Cionni Ring কখন লাগে?

লেন্স ধরে রাখার সূক্ষ্ম তন্তু (জোনিউল) দুর্বল বা ছিঁড়ে গেলে ক্যাপসুলকে স্থিতিশীল রাখতে Cionni ক্যাপসুলার টেনশন রিং ব্যবহার করা হয় — যেমন আঘাত, সিউডোএক্সফোলিয়েশন, মারফান সিনড্রোম, একটোপিয়া লেন্টিস বা আগের অপারেশনের পরে।

Cionni Ring-এর স্ক্লেরাল ফিক্সেশন কী?

সেলাইয়ের সাহায্যে রিংটিকে চোখের সাদা অংশে (স্ক্লেরা) আটকে দেওয়া হয়। এতে লেন্সের ক্যাপসুল ও কৃত্রিম লেন্স দীর্ঘমেয়াদে স্থির ও সুরক্ষিত থাকে।

Prethreaded Needle-Assisted Scleral Fixation কী?

এটি একটি উন্নত সার্জিক্যাল কৌশল, যেখানে অপারেশনের আগেই সূঁচে সেলাই পরিয়ে নেওয়া হয়। এতে Cionni Ring আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে ও কম নাড়াচাড়ায় চোখের সাদা অংশে (স্ক্লেরা) স্থির করা সম্ভব হয়।

চোখের ভেতরে কি সেলাই থাকবে?

জটিল অপারেশনে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সেলাই স্থায়ীভাবে থেকে যায়। সাধারণত তা চোখে দেখা যায় না এবং অনুভবও হয় না।

এসব অপারেশন কি নিরাপদ?

প্রতিটি অপারেশনেই কিছু ঝুঁকি থাকে। তবে যথাযথ মূল্যায়ন, আধুনিক কৌশল ও অভিজ্ঞ পরিচর্যার মাধ্যমে জটিল চোখেও অনেক ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

সাধারণ

কত দিন পরপর চোখ পরীক্ষা করানো উচিত?

সাধারণভাবে প্রতি এক থেকে দুই বছরে একবার পূর্ণাঙ্গ চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। ডায়াবেটিস, গ্লুকোমা বা অন্য চোখের রোগ থাকলে আরও ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন হয়।

ডায়াবেটিস কি চোখের ক্ষতি করে?

হ্যাঁ। ডায়াবেটিস থেকে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, ছানি, গ্লুকোমাসহ দৃষ্টিশক্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নানা সমস্যা হতে পারে।

চেম্বারে আসার সময় কী কী আনব?

আগের প্রেসক্রিপশন, আগের রিপোর্ট, বর্তমানে যেসব ওষুধ খাচ্ছেন তার তালিকা, ব্যবহৃত চশমা এবং আগে কোনো অপারেশন হয়ে থাকলে তার কাগজপত্র।

এখানে দেওয়া তথ্য সাধারণ ধারণার জন্য; এটি সরাসরি পরীক্ষার বিকল্প নয়। প্রতিটি চোখ আলাদা, এবং সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে আপনার নিজের পরীক্ষার ফলাফলের উপর। তাই নিজের অবস্থা নিয়ে চেম্বারে সরাসরি আলোচনা করুন।

এই তথ্য কীভাবে প্রস্তুত করা হয়

এখানকার উত্তরগুলো ডা. মো. ইফতেখার ইকবাল বর্তমান চক্ষুচিকিৎসা অনুশীলন ও পিয়ার-রিভিউড গবেষণার ভিত্তিতে লিখেছেন ও পর্যালোচনা করেছেন। বছরে অন্তত একবার, এবং চিকিৎসাপদ্ধতিতে পরিবর্তন এলে তার আগেই, এগুলো হালনাগাদ করা হয়। যেখানে তথ্য নিশ্চিত নয় বা উত্তর ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়, সেখানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও কিছু জানতে চান?

আপনার প্রশ্নের উত্তর এখানে না পেলে চেম্বারে এসে জিজ্ঞাসা করুন, অথবা লিখে পাঠান।